আর্নেস্তো
চে গুয়েভারাকে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী বলেই সবাই চেনে। আর্জেন্টাইন এই গেরিলা
কিউবার পাশাপাশি যুদ্ধ করেছেন কঙ্গো আর বলিভিয়াতে। অথচ এই চে গুয়েভারার
মতোই একজন বিপ্লবী কিন্তু খোদ এই বঙ্গভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দেশ ছেড়ে
তিনি গিয়েছিলেন সুদূর মেক্সিকোতে। মেক্সিকো আর ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির
প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন তিনি। বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায় ওরফে এম এন রায়
আজকের যুগে একজন বিস্মৃতপ্রায় মানুষ হতে পারেন, কিন্তু গত শতকের দুটি
মহাযুদ্ধ আর তার আগের কিংবা পরের উত্তাল জাতীয়তাবাদ আর বিপ্লবের ভিড়ে এই
নামটি কিন্তু কম কৃতিত্বের অধিকারী নয়।
এম এন রায়; Image Source: 2.bp.blogspot.com
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন
জন্মের
পর তার নাম রাখা হয় নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। পরে নাম পাল্টে হন
মানবেন্দ্রনাথ রায় ওরফে এম এন রায়। ১৮৮৭ সালে অবিভক্ত বাংলার ২৪ পরগণা
জেলার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি দ্রুতই
জড়িয়ে পড়েন স্বাধীনতাকামীদের সাথে। সেকালে বাংলা মুলুকে, বিশেষ করে হিন্দু
ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র বা স্বামী বিবেকানন্দের খুবই নামডাক।
তাদের লেখনী পড়ে অনেক যুবা তখন স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়বার জন্য হন্যে
হয়ে উঠছে।
১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ এই আগুনকে আরো উসকে দিল। এম এন রায় এই ছাত্রদের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ক্রমে তার সাথে পরিচয় হয় বারীন ঘোষ
আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে। উল্লেখ্য, এম এন রায় সে সময়কার অনুশীলন সমিতি,
যুগান্তর বা বাঘা যতীনের দলবল, সবার সাথেই কমবেশি যোগাযোগ রাখতেন। সে
হিসেবে তাকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র ধারাটির অন্যতম অংশ বললে
বাড়িয়ে বলা হবে না।
বারীন ঘোষ; Image Source: marxist indiana১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ বেঁধে গেলে ভারতীয়রা জার্মানদের সাহায্য নিয়ে নিজেদেরকে স্বাধীন করবার স্বপ্ন দেখা শুরু
করে। বাঙালী বিপ্লবীদের অনেকেই সে সময় বার্লিনে থাকতেন। তারা কাইজার
ভিলহেলমের সাথে যোগাযোগ করে ইতিবাচক সম্মতি পান। পরিকল্পনা করা হয় যে,
ইন্দোনেশিয়াতে অস্ত্রশস্ত্র আর কামান সজ্জিত অনেকগুলো জার্মান জাহাজ এসে
ভিড়বে। পরে এদের সাহায্যে বিপ্লবীরা প্রথমে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ আর পরে
উড়িষ্যাতে হামলা চালাবেন। কিন্তু সব পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল, যখন এম এন
রায় ১৯১৫ সালে ইন্দোনেশিয়াতে গেলেন। যেদিন পরিকল্পনা শুরু হওয়ার কথা সেদিনই
রহস্যজনকভাবে জার্মান কনসাল জেনারেল গায়েব হয়ে গেলেন। জাহাজ তো দূরের কথা,
একটা পিস্তল পর্যন্ত জুটলো না। সামান্য কিছু অর্থসাহায্য পেলেন এম এন রায়।
ওদিকে ভারতে এই গুপ্ত পরিকল্পনার কথা ফাঁস হয়ে গেলে ব্রিটিশরা পাহারা
বাড়িয়ে দেয়। বারীন ঘোষ পুলিশের সাথে সংঘর্ষে মারা পড়েন। সশস্ত্র আন্দোলনের
পরিকল্পনা ফিকে হয়ে যেতে থাকে।
হাল না ছেড়ে রায় যাত্রা করলেন জাপানে।
সেখানে জার্মান বা জাপান কোনো পক্ষই তাকে সাহায্য করতে রাজি হলো না।
নিরুপায় রায় দেখা করলেন চীনা জাতীয়তাবাদী নেতা সান ইয়াত সেনের সাথে। কিন্তু
তিনিও নেতিবাচক মতামত দিলেন ভারতে বিপ্লবের ব্যাপারে। শেষমেষ রায় ভুয়া
কাগজপত্র যোগাড় করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলেন। তার আশা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের
জার্মান দূতাবাস তাকে সাহায্য করবে।
মেক্সিকো
যুক্তরাষ্ট্রের
দক্ষিণের শহর পালো আলতোতে লুকিয়ে থাকবার সময় রায় ইভিলিন নাম্নী এক মহিলাকে
বিয়ে করেন। দুজনে মিলে নিউ ইয়র্ক যান। এখানেই এম এন রায় কম্যুনিজম নিয়ে
আগ্রহী হয়ে পড়েন। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বেশিদিন থাকা গেল না। ব্রিটিশ
গোয়েন্দাদের ভয়ে এই জুটি শেষমেষ সীমান্ত পার হয়ে মেক্সিকোতে চলে যায়। পথে
জার্মান গোয়েন্দারা রায়কে বিপুল পরিমাণ টাকা দেন।
এম এন রায় এবং তার স্ত্রী; Image Source: 4.bp.blogspot.comমেক্সিকোতে ১৯১৭ সালে রায় একটি সোশ্যালিস্ট পার্টি গঠন করেন।
এটিই পরে মেক্সিকান কম্যুনিস্ট পার্টিতে রূপ পায় ১৯১৯ সালে। সোভিয়েত
কম্যুনিস্ট পার্টির পর এটাই ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় মাত্র সমাজতান্ত্রিক দল।
রায় তার লেখালেখির সুবাদে বিশ্বের তাবত কম্যুনিস্টপন্থী নেতাদের সম্মেলন ২য়
ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে যোগদান করেন। লেনিন তাকে বিশেষ সমাদর করতেন। রায়
কম্যুনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল তথা কমিনটার্নের সাথেও যুক্ত ছিলেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন
লেনিনের
নির্দেশে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে রায়কে ভারতীয়দের সংগঠিত করে
পুনরায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন শুরু করবার সুযোগ করে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য,
রায়ের সাথে ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতা চিত্ত রঞ্জন দাসের যোগাযোগ ছিল। যা-ই
হোক, রায় ১৯২০ সালে গঠন করেন ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি।
এদিকে
মস্কোতে শুরু হয়েছে আরেক ঝামেলা। ১৯২৪ সালে লেনিন মারা যাওয়ার পর তার
উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব বেঁধে গিয়েছে। একদিকে স্ট্যালিন,
জিমেনিয়েভ, কামেনেভ, আর অন্যদিকে ট্রটস্কি। ট্রটস্কি শেষমেষ দেশ ছেড়ে
পালান। রায়কে স্ট্যালিন ট্রটস্কিপন্থী হিসেবেই দেখতেন হয়তো। কিন্তু
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন নেতাকে কব্জা করবার সুযোগ তিনি পাচ্ছিলেন
না। শেষমেষ সুযোগ এলো ১৯২৭ সালে। রায় চীনের ক্যান্টনে গিয়েছিলেন সেখানে
বিপ্লবীদেরকে সাহায্য করতে। তো চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে তার বিরোধ
বেঁধে গেলে স্ট্যালিন তার দরকারি অজুহাত পেয়ে গেলেন। ১৯২৮ সালে এম এন রায়
সোভিয়েত ইউনিয়ন ছেড়ে জার্মানি চলে যেতে বাধ্য হলেন।
লেনিন ও রায়; Image Source: sreenivasarao's blogs
আবার ভারত
১৯৩০
সালে, প্রায় ১৬ বছর পর এম এন রায় ভারতে ফিরলেন। যদিও নেহেরু বা সুভাষ
চন্দ্র বোস তাকে বিশেষ সমাদর করলেন, কিন্তু এটাও পরিষ্কার হয়ে গেলো যে তারা
তাকে জায়গা ছেড়ে দেবেন না। ওদিকে গান্ধীর সাথে তার বনে না। ব্রিটিশ পুলিশ
তো ওঁত পেতেই ছিল। দেশে ফেরার কয়েক মাসের মধ্যে তাকে জেলে পোরা হয়।
প্রহসনের বিচার শেষে জেল খাটতে হয় ছয় বছর। এতেই রায়ের শরীর একদম ভেঙে পড়ে।
তিনি আরো অসংখ্য কম্যুনিস্ট নেতাদের মতো বারবার কোন্দল না পাকিয়ে বরং
কম্যুনিস্টদের আহ্বান করেন যেন তারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেয়। এতে
করে ডাকসাইটে কম্যুনিস্টদের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে এরই
মধ্যে তিনি ১৯৩৪ সালে ভারতীয় গণপরিষদ গঠনের দাবি জানান। পরে কংগ্রেস এই
দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বাঁধলে এম এন রায়
ভারতীয়দেরকে আহ্বান জানান যেন তারা ব্রিটিশদেরকে সাহায্য করে। রায়ের
বক্তব্য ছিল, ফ্যাসিস্ট বা নাজী সরকার যুদ্ধে জিতলে ভারত আর কোনোদিনই
স্বাধীনতা পাবে না। ওদিকে গান্ধী ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলন শুরু করেন,
সুভাষ বোস জাপানী আর জার্মানদের সাহায্য নিয়ে গড়ে তোলেন আজাদ হিন্দ ফোর্স।
কম্যুনিস্ট বা কংগ্রেসীরা রায়ের এই পথ পরিবর্তন ভালো চোখে দেখেনি। অনেকটা
এই সময়েই রায় 'নিও হিউম্যানিজম' নামের একটি নতুন তত্ত্ব হাজির করেন। মূলত
কংগ্রেস আর কম্যুনিস্টদের সাথে মতের মিল না হওয়াতেও এই নতুন তত্ত্ব।
এম এন রায়; Image Source: The Logical Indianএম এন রায় র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে দল গঠন করে নিজের তত্ত্ব
প্রচার করা শুরু করেন। তার বিখ্যাত 'রিজন, রোমান্টিসিজম অ্যান্ড
রেভল্যুশন’ গ্রন্থে তিনি নিজের নিও হিউম্যানিজম নিয়ে নতুন ধারার একটি
রাজনৈতিক আন্দোলন গঠনের প্রয়াস পান। এটি মূলত মানবিক গুণাবলী দ্বারা
পরিচালিত ধর্মনিরপেক্ষ একটি সমাজ গঠনের প্রয়াস পেত, যেখানে জ্ঞান, মুক্তি
আর স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক
হিউম্যানিস্ট আন্দোলনের অপেক্ষাকৃত র্যাডিক্যাল ঘরানাটিই রায়ের নিউ হিউম্যানিজমের সারবত্তা।
স্বাধীন
ভারতে এম এন রায়কে খুব উঁচুদরের তাত্ত্বিক হিসেবে প্রচুর সম্মান দেখানো
হলেও রাজনৈতিকভাবে তিনি একরকম শক্তিহীন হয়ে পড়েন। শারীরিকভাবেও হয়ে
পড়েছিলেন অসুস্থ। কম্যুনিস্টদের মধ্যে বহু ভাঙনের ফলে কংগ্রেসই ভারতের
সবথেকে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাঙালি বিপ্লবী
মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯৫৪ সালে দেরাদুনে মৃত্যুবরণ করেন। তাবত বিশ্ব ঘুরে যে
বিপ্লবের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা অনেকাংশেই সাকার না হওয়ার ফলেই বোধহয়
বিস্মৃত হয়ে পড়েছেন আধুনিক রাজনীতির পাঠে।
আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে বনাম প্যারাগুয়ে: লাতিন আমেরিকার মহাযুদ্ধ
দেশে দেশে যুদ্ধ বাঁধবার কথা উঠলে দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান অবস্থা বেশ
সন্তোষজনক বলতে হয়। দু-দুটো মহাযুদ্ধের ছোবল থেকে বেঁচে যাওয়ার কারণেই
হয়তোবা এই অবস্থা। তাছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার একনায়কেরা নিজেদের জনগণকে
শায়েস্তা করতে আর গৃহযুদ্ধের হ্যাপা সামলাতেই বেশি মনোযোগী থাকায়
ফকল্যান্ডের যুদ্ধ ছাড়া হাল আমলে তেমন কোনো রক্তক্ষয়ী আন্তঃদেশীয় যুদ্ধ
দক্ষিণ আমেরিকায় সংঘটিত হয়নি। তবে গত শতকের কথা আলাদা।
প্যারাগুয়ে,
পারানা আর উরুগুয়ে নদী দ্বারা পুষ্ট লা প্লাটা অঞ্চল আয়তনে দক্ষিণ আমেরিকার
চারভাগের একভাগ এবং আমাজন অঞ্চলের পরেই মহাদেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম
অববাহিকা। দক্ষিণ-পূর্ব বলিভিয়া, দক্ষিণ ব্রাজিল, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে আর
আর্জেন্টিনার উত্তরভাগ জুড়ে বিস্তৃত অত্যন্ত উর্বর এই অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ
নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উত্তেজনার অন্ত ছিল না।
১৮৬৪ সালে ব্রাজিল,
আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ে মিলে লড়তে নেমেছিল প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে। লা
প্লাটার বিরাট অববাহিকা অঞ্চল জুড়ে এই বিরাট যুদ্ধে প্যারাগুয়ে দেশটি
সম্পূর্ণ গুড়িয়ে গিয়েছিল। প্রাণে বেঁচে ছিল মোটে হাজার তিরিশেক পুরুষ।
লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে প্যারাগুয়ের যুদ্ধ নামে পরিচিত এই যুদ্ধ নিয়েই আজকে
আলাপ হবে।
প্রেক্ষাপট
সুশাসক হিসেবে স্প্যানিশ বা
পর্তুগীজদের সুনাম কোনোকালেই ছিল না। দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে স্প্যানিশ বা
পর্তুগীজরা বড় বড় শহরগুলো বসিয়েছে সমুদ্রতীর ঘেঁষে। বিরাট এই মহাদেশের
ভেতরটা একেবারে ফাঁকা ছিল না অবশ্য। গহীন জঙ্গল আর বিরাট জলাভূমির মাঝে
বিশাল বিশাল র্যাঞ্চ বসিয়ে থাকতো গাউচোদের
দল। আর জঙ্গলে, প্রান্তরে পালিয়ে বেড়াতো রেড ইন্ডিয়ান গোত্রগুলো। ইউরোপীয়
শাসকেরা যখন বিদায় নেওয়া শুরু করে, তখন তাদের সৃষ্ট বিশৃংখল শাসনব্যবস্থা
জন্ম দেয় অনেকগুলো যুদ্ধের।
লা প্লাটা অববাহিকা; Image Source: FAOমে বিপ্লবের
ফলশ্রুতিতে ১৮১০ সালে আর্জেন্টিনা স্বাধীন হয়। ১৮১১ সালে প্যারাগুয়ে
স্বাধীন হয়। উরুগুয়ে ১৮২১ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সাথে থাকবার পরে
ব্রাজিলের অধীনে চলে যায়। পরে ১৮২৮ সালে উরুগুয়েও স্বাধীনতা লাভ করে।
প্যারাগুয়ে দেশটি সে আমলে আকারে ছিল বিরাট। বর্তমান আর্জেন্টিনার মিসিওনেস,
ফরমোজা, ব্রাজিলের রিও গ্রান্দে দে সুল প্রদেশগুলো প্যারাগুয়ের সরকারের
হাতে ছিল। প্যারাগুয়ের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ছিল ব্রাজিলের মাতে গ্রোসো
প্রদেশ। প্রদেশটি ব্রাজিলের কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিল নদীপথের মাধ্যমে। এই প্যারাগুয়ে নদী
আবার প্যারাগুয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রাণাধীন অঞ্চল দিয়ে বয়ে গিয়েছে। ব্রাজিলের
জাহাজগুলো প্যারাগুয়ে সরকারকে চড়া শুল্ক দিতে বাধ্য থাকতো। এছাড়া আপা আর
ব্রাঙ্কো নদীর মধ্যকার অঞ্চলের মালিকানা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ ছিল।
প্যারাগুয়ের
দক্ষিণের প্রতিবেশী আর্জেন্টিনার ক্ষমতায় ছিলেন বার্তেলোমি মিত্রে।
প্যারাগুয়ের একনায়ক ফ্রান্সিসকো সোলানো তাকে বেশ বিশ্বাস করতেন। ওদিকে
উরুগুয়ের ব্রাজিলপন্থী দল কলোরাডো পার্টি এবং ক্ষমতাসীন প্যারাগুয়েপন্থী দল
ব্লাঙ্কোর মধ্যে হরদম মারামারি লেগেই থাকতো। ১৮৬৪ সাল নাগাদ এই দাঙ্গাহাঙ্গামা অনেক বেড়ে গেলে প্যারাগুয়ে শংকিত হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সিসকো সোলানো লোপেজ; Image Source: Paraguay.comস্বাধীনতার
পর থেকেই প্যারাগুয়ে শাসন করেছেন হোসে ফ্রান্সিয়া, তার ভাতিজা কার্লোস
সোলানো লোপেজ এবং তার বড় ছেলে ফ্রান্সিসকো সোলানো লোপেজ। এই শাসকেরা কেউ
বাইরের বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখতেন না বললেই চলে। কড়া রক্ষণাত্মক নীতির
কল্যাণে প্যারাগুয়ে সে আমলে স্বনির্ভর একটি দেশ ছিল, প্রতিবেশীদের তুলনায়
জীবনযাত্রার মানও ছিল অনেক উঁচু। প্যারাগুয়ের শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল, ছিল
লক্ষাধিক সৈন্যের বিরাট এক সেনাবাহিনী। ফ্রান্সিসকো সোলানো নিজের দেশ তথা
নিজের ক্ষমতা জাহির করবার জন্য অত্যন্ত ব্যগ্র হয়ে উঠেছিলেন।
১৮৬০ এর
দশকে প্যারাগুয়ের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৩-১৪ লক্ষের মতো। বিপরীতে ব্রাজিল,
আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ের সম্মিলিত জনসংখ্যা ছিল ১ কোটির বেশি। কিন্তু
আত্মবিশ্বাসী লোপেজ ওসব নিয়ে ভাবলেন না। উরুগুয়েতে ব্লাংকো আর কলোরাডো
পার্টির মধ্যকার যুদ্ধের দায়ে তিনি ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।
প্যারাগুয়ের আক্রমণ
লোপেজ
ভেবেছিলেন মিত্রে যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকবেন। তাই ১৮৬৪ সালে ব্রাজিলের মাতে
গ্রোসো প্রদেশে হামলার পাশাপাশি তিনি আর্জেন্টিনার কাছে বিশেষ একটি আবদার
পাঠালেন। প্যারাগুয়ে আর উরুগুয়ের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই, উরুগুয়েতে যেতে
হলে পথিমধ্যে আর্জেন্টিনার করিয়ান্থেস অথবা ব্রাজিলের রিও গ্রান্দে দে সুলে
প্রবেশ করা লাগবে। ব্রাজিল যেহেতু শত্রুদেশ, কাজেই লোপেজ দাবি জানালেন যেন
তার সেনাদেরকে আর্জেন্টিনা নিরাপদে উরুগুয়েতে যাওয়ার সুযোগ দেয়।
ব্রাজিলীয় সেনাদল; Image Source: Wikiwandকিন্তু
প্রত্যাশামতো আর্জেন্টিনা কোনো সাহায্য তো করলোই না, উল্টো নিজেদের নৌপথ
ব্যবহার করার সুযোগ করে দিল ব্রাজিলকে। ক্রুদ্ধ সোলানো ১৮৬৫ সালে যুগপৎ
আক্রমণ করে বসলেন করিয়ান্থেস আর রিও গ্রান্দে দে সুল। ফলে আর্জেন্টাইন শাসক
ব্রাজিল আর উরুগুয়ের ব্রাজিল পন্থীদের সাথে জোট বাঁধলেন। সেসময় সবাই
ভেবেছিল প্যারাগুয়েই আসল দোষী, কিন্তু পরে দেখা যায় উরুগুয়ে, ব্রাজিল আর
আর্জেন্টিনা আগেই প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটা গোপন সম্মতি
চুক্তি করেছে। যা-ই হোক, করিয়ান্থেস আক্রমণ করার ফলে আর্জেন্টিনায়
প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে বিপুল জনমত গড়ে ওঠে। লোপেজের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে
নামলো আর একটি দেশ।
ব্রাজিলের পাল্টা জবাব, আর্জেন্টিনার সাফল্য
রিয়েচুয়েলোর
যুদ্ধে প্যারাগুয়ে নৌবাহিনীকে গুঁড়িয়ে দিয়ে যৌথশক্তি যুদ্ধে নামলো। এর আগে
প্যারাগুয়ে বেশ কতগুলো যুদ্ধে জিতলেও নৌবাহিনীর অনুপস্থিতি তাদেরকে ভোগাতে
লাগলো। ঐ অঞ্চলে নদীপথই ছিল রসদ সরবরাহের সেরা ভরসা। ১৮৬৫ সালের শেষে
আর্জেন্টিনা হারানো জায়গা পুনরুদ্ধার করে ফেললো, ব্রাজিলও এগোতে লাগলো।
পরের বছর প্যারাগুয়ের মাটিতে পা রাখলো শত্রুসেনারা। তুয়ুতির যুদ্ধ সহ
কয়েকটা মারাত্মক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হারার পর সোলানো লোপেজ বুঝলেন যুদ্ধ জেতা
সম্ভব নয়। কিন্তু তার সন্ধিপ্রস্তাব কেউ মানলো না। উল্টো কড়া কড়া সব দাবি
জানাতে লাগলো। কিছুকাল বাদে কুরুপাইটির যুদ্ধে লোপেজের সেনাদল জিতে গেলে
ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নেতাদের মধ্যে মতভেদ শুরু হয়। যা-ই হোক, পরে তারা
আবার একজোট হয়ে হামলা শুরু করে। ১৮৬৮ সালে দুর্ভেদ্য হুমাইতা দুর্গের পতন
ঘটে। মিত্রশক্তির সর্বাধিনায়ক মিত্রে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে যুদ্ধ মূলত
ব্রাজিলের সেনাদলই চালাবে।
বাম দিক থেকে- আর্জেন্টাইন, ব্রাজিলীয় আর উরুগুইয়ান সৈন্য; Image Source: pinterestতবে
সবদিক থেকে ঘেরাও হয়ে প্যারাগুয়ে সরকারের অবস্থা তখন খুবই দুর্বল। বড়
নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার নৌবাহিনী। এদিকে
পশ্চিমের প্রতিবেশী বলিভিয়া সরকারও বন্ধুভাবাপন্ন নয়। ১৯৬৯ এর জানুয়ারিতে
রাজধানী আসুনসিওনের পতন হলো। প্রথাগত যুদ্ধেরও ইতি ঘটে প্যারাগুয়ের মাটিতে।
ফ্রান্সিসকো সোলানো লোপেজ পালিয়ে যান।
গেরিলা লোপেজ
প্যারাগুয়ের একনায়ক ফ্রান্সিসকো সোলানো
কিন্তু জনপ্রিয় লোক ছিলেন। তার সেনাদলের প্রায় পুরোটাই সাবাড় হয়ে গেলেও
তিনি হতোদ্যম হলেন না। উল্টো শিশু, কিশোর, নারীসহ অসংখ্য মানুষ নিয়ে বিরাট
এক গেরিলা বাহিনী গড়ে তুললেন। তাদের না ছিল উর্দি, না ছিল প্রশিক্ষণ। পুরনো
বন্দুক, তলোয়ারে সজ্জিত এই বাহিনী ব্রাজিলের সামনে বিশেষ কোনো প্রতিরোধ
গড়তে পারেনি।
প্যারাগুয়েতে রাস্তাঘাট বিশেষ ছিল না। যোগাযোগ যা হওয়ার
সবই নৌপথে। এখন নৌপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় প্যারাগুয়ের
গেরিলারা বিশেষ সমস্যায় পড়ে যায়। শত্রুরা প্যারাগুইয়ানদের উপর অকথ্য
অত্যাচার চালায়। লুটপাট, ধর্ষণ, খুনের পাশাপাশি আগুনে পুড়িয়ে দেয় ঘরবাড়ি,
খেত খামার। ১৮৭০ সালে সেরো কোরার জঙ্গলের মধ্যে এক নদীর তীরে ব্রাজিলীয়
সেনাদের সাথে সংঘর্ষে নিহত হন প্রেসিডেন্ট লোপেজ। প্যারাগুয়াইয়ানরা অবশেষে
যুদ্ধের ইতি টানতে বাধ্য হয়।
সেরো কোরার জঙ্গল; Image Source: Wikimedia Commons
পরিশেষে
লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের সবথেকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ
হিসেবে ধরা হয় প্যারাগুয়ে যুদ্ধকে। প্যারাগুয়ে তার মোট জনসংখ্যার ৬০
শতাংশকে যুদ্ধে হারায়। কোনো কোনো গবেষকের মতে পুরুষদের ৯০ ভাগই নাকি যুদ্ধে
মারা পড়েছিল। এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত কম থাকায় সংখ্যার ব্যাপারে একেবারে
নিশ্চিত হওয়া সম্ভব না।
বর্তমান প্যারাগুয়ে; Image Source: Stratfor Worldviewবিজয়ী
দেশগুলো প্যারাগুয়েকে ইচ্ছেমত কাটাছেঁড়া করে নিল। মাতে গ্রোসো দে সুল
প্রদেশটি নিল ব্রাজিল। ফরমোসা আর মিসিওনেস প্রদেশ কব্জা করলো আর্জেন্টিনা।
এই মারাত্মক ক্ষতি সামলাতে প্যারাগুয়ের বহু দশক লেগে গিয়েছে। দেশটি
স্বাধীনতা পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগও হারায় এই যুদ্ধের কারণে।
প্যারাগুয়ের প্রধান পণ্য ইয়ারবা মাতের বাজার হাতছাড়া হয়ে যায়। যুদ্ধ
পরবর্তী দশকের পর দশক কুশাসনের কারণে প্রতিবেশীদের তুলনায় প্যারাগুয়ে অনেক
পিছিয়ে পড়ে।
প্রতিবেশীদের মধ্যে ব্রাজিল লাতিন আমেরিকায় যুদ্ধে জিতে
প্রচুর যশ কামিয়ে নেয়। এর সেনাবাহিনী সামনের দশকগুলোতে খুবই প্রভাবশালী হয়ে
ওঠে। উরুগুয়ের ব্রাজিলপন্থী কলোরাডো দল ১৯৫৮ সাল অবধি ক্ষমতা ধরে রাখে।
আর্জেন্টিনা যুদ্ধের পরে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি করে এবং বিশ্বের সপ্তম
শীর্ষ ধনী দেশে পরিণত হয়।
ফারাও ডায়েরি: কেমন ছিল প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা ব্যবস্থা
কাঁধে
কাপড়ের ঝোলা চাপিয়ে শক্ত পাথুরে পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন পেশেহেত। মধ্যবয়স্ক
এই নারী পেশায় একজন ডাক্তার। প্রতিদিন ভোরে উঠে শহরের ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ
নেন অসুস্থ মানুষের। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কম
করে হলেও ২০ জন মানুষের চিকিৎসা করেছেন তিনি। রোগী দেখা ছাড়াও
শিক্ষানবিশদের মাঝে বিলিয়ে দেন চিকিৎসার গূঢ় রহস্য। হাতে কলমে দক্ষ করে
তুলতে বেশ পরিশ্রম হয় তার। তারপরও পেশেহেত তার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট। পরের
আনন্দে নিজেকে উৎসর্গ করার মাঝে এক স্বর্গীয় শান্তি লাভ করেছেন তিনি।
সেদিনের রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর যাওয়ার পর এক আগন্তুকের
দেখা পেলেন তিনি। আগন্তুক তাকে দেখেই চিনে ফেললেন।
তার পরনে
ডাক্তারের পোশাক দেখে দূর থেকে তাকে চেনা যায়। আগন্তুক পেশেহেতের নিকট গিয়ে
তার ডান হাত মেলে ধরলেন। হাতের তালুর উল্টো পিঠে বেশ বড় গোলাকার ফোঁড়া
জন্ম নিয়েছে। টকটকে লাল রঙের ফোঁড়া দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন, আগন্তুককে
বৃশ্চিক (কাঁকড়া) কামড়েছে। পেশেহেত তার ঝোলা কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে
রাখলেন। তারপর রোগীর হাত ধরে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে মন্ত্র জপতে লাগলেন।
চিকিৎসার দেবী সেরকেতকে উৎসর্গ করে মন্ত্র জপার মাধ্যমেই তিনি বিষের প্রাথমিক চিকিৎসা সারবেন। মন্ত্রপাঠ শেষে শুরু হবে আসল চিকিৎসা।
তখন
পেশেহেত ডাক্তারের বিশেষ ছুরির সাহায্যে ফোঁড়াটুকু কেটে ফেলবেন। তারপর
বিভিন্ন ভেষজ মিশ্রণ দিয়ে জখম পরিষ্কার করে দেবেন। এভাবে আরেকজন মানুষের
সেবা করলেন তিনি। তার মতো আরো শত শত চিকিৎসকের নিষ্ঠার মাধ্যমে গড়ে উঠছিলো
পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থা। সভ্য পৃথিবীতে চিকিৎসা ব্যবস্থার
শুরু হয় আফ্রিকার গৌরব প্রাচীন মিশরের মাটিতে। আমরা আধুনিক যুগে Medical Care বলতে যা বুঝি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিলো আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ সালে। তবে চিকিৎসা বলতে আমরা যা বুঝি, তখন সেটা এর থেকে অনেকটা ভিন্ন ছিল।
নারী চিকিৎসক পেশেহেত; Image Source: Twitterপ্রাচীন
মিশরে রোগের কারণ হিসেবে মানুষ দেবতাদের অসন্তুষ্টিকে দায়ী করতো। আমাদের
চোখের অগোচরে চলাফেরা করা অদৃশ্য আত্মারা বিভিন্ন কারণে আমাদের শরীরের
স্বাভাবিক অবস্থাকে বিকল করে দিতো। যার কারণে মানুষ রোগে ভুগতো, মহামারিতে
আক্রান্ত হতো। গ্রামের পর গ্রাম মহামারির প্রকোপে সাফ হয়ে যেতো।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রদূত মিশর সভ্যতার বুদ্ধিজীবীগণ এই মহামারির হাত থেকে
বেঁচে থাকতে গবেষণা শুরু করেন। তাদের গবেষণায় জন্ম নেয় মানব দেহের রহস্যময় 'চ্যানেল' তত্ত্ব।
ইংরেজি
চ্যানেল শব্দের অর্থ খাল। কৃষিক্ষেত্রে কৃষকদের খাল খনন থেকে এই তত্ত্বের
সৃষ্টি হয়েছিল বলে এরূপ নামকরণ করা হয়। ধারণা করা হতো, মানুষের হৃদপিণ্ডের
মোট ৪৬টি চ্যানেল রয়েছে। যখন অশুভ দেবতা বেহেদু
তার ক্ষমতাবলে হৃদপিণ্ডের চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেন, তখন মানুষ বিভিন্ন
রোগে আক্রান্ত হয়। মিশরীয়দের মতে, মানুষের জীবনের নিয়ন্ত্রক ছিলেন দেবতারা।
থোথ নামক এক দেবতার আশীর্বাদে মানুষ গর্ভধারণ করে এবং বেস নামক আরেক
দেবতার মাধ্যমে একজন নারী বাচ্চা প্রসব করে।
আপাতদৃষ্টিতে চ্যানেল
তত্ত্ব অনেকটা ভুল মনে হলেও, সভ্যতার অগ্রসরতায় এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একদম প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ রোগের কারণ হিসেবে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক
কারণকে দায়ী করলেও এই তত্ত্বের মাধ্যমে চিকিৎসকগণ রোগের সাথে মানবদেহের
যোগসূত্র স্থাপন করতে সক্ষম হন। তাই চ্যানেল তত্ত্বকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের
ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।
চিত্রকর্মে মিশরীয় কবিরাজ; Image Source: MyViralBoxনতুন
তত্ত্ব আবির্ভাবের সাথে তাল মিলিয়ে মিশরের চিকিৎসকের আসনে আসীন হন মিশরীয়
কবিরাজগণ। এর পূর্বে চিকিৎসার কাজ করতেন মন্দিরের পুরোহিতগণ। তবে এ বিষয়ে
আরেকটু পরে আলোকপাত করা হবে। একদিকে যেমন চিকিৎসকগণ মানবদেহের রহস্য
উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছিলেন, অপরদিকে বিভিন্ন অঞ্চলে অদ্ভুত চিকিৎসা পদ্ধতির
জন্ম হতে থাকে। মিশরের এক অঞ্চলে ডাক্তারগণ চিকিৎসার জন্য নীল নদের বৈদ্যুতিক মাছ
ব্যবহার শুরু করেন। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, তৎকালীন মানুষরা মাছের
বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাকে জাদু হিসেবে দেখতো। তাই বৈদ্যুতিক মাছ চূর্ণ করে
রোগীর ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বহু মানুষ
এই ঔষধ সেবন করে আরোগ্য লাভ করতেন। হয়তো পুরো ব্যাপারটি মনস্তাত্ত্বিক।
কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারগণ উত্তম চিকিৎসা প্রদান করতেন বলে
প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন মিশরের ডাক্তারগণ স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য
অপরিষ্কার খাদ্য এবং কাঁচা মাছ ভক্ষণ করতে নিষেধ করতেন। সর্বপ্রথম মিশরে
হাড় ভাঙা, পা মচকানোর চিকিৎসা এবং জখম সেলাই করানোর প্রচলন শুরু হয়। মিশরের
দন্ত চিকিৎসকগণ দাঁত তোলা এবং দাঁত বাঁধাইয়ের কাজ করতে পারতেন। মিশরের চিকিৎসকগণ দাঁতের মাজন এবং টুথপেস্ট
আবিষ্কার করেছিলেন। দিনে দিনে মিশরের চিকিৎসকদের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে
থাকে। ভিনদেশি সম্রাট, রাজা, বাদশাহগণ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে মিশর যাত্রা
শুরু করতেন।
প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বের দাঁত বাঁধাই; Image Source: Pinterestচিকিৎসার জ্ঞান প্রসার এবং উন্নতমানের চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্যে মিশরজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। বুবাস্তিস এবং আবিদস অঞ্চলে এরূপ দু'টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম শোনা যায়। পেশাজীবী ডাক্তারগণ House of Life-নামক শিক্ষাকেন্দ্রে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ নিতেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নারী-পুরুষ সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
চিকিৎসা
বিজ্ঞানের শুরুর দিকে মানবদেহ নিয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায়, যেকোনো রোগ
প্রতিরোধের চেয়ে জখমের চিকিৎসা করা সহজতর ছিল। তাই সাধারণ মানুষ বিশ্বাস
করতো, পূর্ব এবং ইহ জনমের পাপের শাস্তিস্বরূপ দেবতারা রোগ প্রদান করতেন।
কিন্তু ঝামেলা বাঁধতো যখন সাধু শ্রেণীর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়তো। তখন ধরা হতো,
হয়তো কোনো অসুরের কোপানলে পড়েছেন সাধু মশাই!
রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার; Image Source: Smithsonian Magazineমিশরের ইতিহাসে প্রথম চিকিৎসকের নাম ছিল ইমহোটেপ। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৬৭ সালে
তিনি মিশরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পেশায় স্থপতি ইমহোটেপ মিশরের বিখ্যাত
পিরামিড নির্মাণের নকশা প্রণয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে প্রমাণ
পাওয়া যায়। দার্শনিকদের ভাষায়, ইমহোটেপ সর্বপ্রথম 'ধর্ম নিরপেক্ষ'
চিকিৎসাব্যবস্থার প্রচলন করেন। তিনি দাবি করতেন, মানুষ প্রাকৃতিকভাবে
বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হয়, এর পেছনে দেবতাদের শাস্তির ধারণা মিথ্যা।
খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ সালের দিকে মিশরের রাজসভার প্রধান চিকিৎসক হিসেবে মেরিতাহ নামক এক নারীকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে মেরিতাহ সর্বপ্রাচীন নারী চিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃত হন। কিন্তু সম্প্রতি খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালে
নিম্ন মিশর অঞ্চলে নাইথের মন্দিরে আরেকজন নারী চিকিৎসকের সন্ধান পাওয়া
যায়। তবে তার নাম জানা সম্ভব হয়নি। মেরিতাহের পর মিশরের সবচেয়ে বিখ্যাত
নারী চিকিৎসক হিসেবে আবির্ভূত হন পেশেহেত।
সমসাময়িক বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে নারীদের চিকিৎসা পেশায় প্রবেশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। তাই খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে
এথেন্সের এগনোডাইস চিকিৎসক হওয়ার উদ্দেশ্যে ইউরোপ থেকে মিশরে পালিয়ে
গিয়েছিলেন। প্রাচীন মিশরে নারীদের চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদানের এরূপ
দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
মিশরে চিকিৎসাক্ষেত্রে নারী-পুরুষদের সমান অধিকার ছিল; Image Source: The Book Palaceকিন্তু
এত স্বাধীনতার পরও মিশরে যে কেউ ইচ্ছা করলেই ডাক্তার হতে পারতো না। আধুনিক
যুগের ভর্তি পরীক্ষার মতো তাদেরকেও বাছাই করা হতো। তবে সেটা গোল্লা ভরাটের
খাতার মতো পদ্ধতি ছিল না। একজন ডাক্তারকে পুঁথিগত শিক্ষার বাইরেও দেহ এবং
আত্মিক দিক থেকে পবিত্র হতে হবে। সেজন্য চিকিৎসকদের মিশরে 'ওয়াবাউ' অর্থাৎ আত্মিকভাবে শুদ্ধ হিসেবে উপাধি প্রদান করে হতো।
একজন
চিকিৎসক যেকোনো অঙ্গ কিংবা রোগ নিয়ে পড়াশোনা করে বিশেষজ্ঞ হতে পারতেন। তবে
আরেকদল ডাক্তার ছিলেন যারা ঔষধপত্রের বদলে জাদু-টোনার মাধ্যমে চিকিৎসা
করতেন। চিকিৎসকগণ সকল রোগের চিকিৎসা করলেও গর্ভবতী নারীর চিকিৎসা এবং
সন্তান জন্ম দেওয়ার অংশটুকু ধাত্রী নারীগণ সম্পন্ন
করতেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। নারী এবং পুরুষগণ
সেবক-সেবিকা হিসেবে ডাক্তারদের সাহায্য করতেন। মিশর সাম্রাজ্যে ডাক্তার,
ধাত্রী এবং সেবিকাদের সমানভাবে মর্যাদা প্রদান করা হতো।
মিশরীয় ধাত্রী মাতাদের সন্তান পরিচর্যার চিত্র; Image Source: Ancient Historyপ্রাচীন
মিশরের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি বর্তমানে
পৃথিবীত বিখ্যাত জাদুঘরসমূহে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণ
এবং যুদ্ধবিগ্রহের জের ধরে বহু মূল্যবান দলিল কালের অতল গহ্বরে বিলীন হয়ে
গিয়েছে। পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে দ্য চেস্টার বিটি
প্যাপিরাস নামক দলিলটি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ সালে রচিত হয়েছিল।
ইতিহাসবিদগণের তথ্যানুযায়ী, প্যাপিরাসের অনুচ্ছেদগুলোয় মানবদেহের
নিম্নাঙ্গের বহু রোগের বর্ণনা এবং চিকিৎসা পদ্ধতি এখানে লিপিবদ্ধ করা
রয়েছে। বার্লিন প্যাপিরাস
নামক পাণ্ডুলিপিটি গর্ভকালীন বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে আলোকপাত
করেছে। এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, যেখানে
গর্ভকালীন চিকিৎসা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাণ্ডুলিপিটি আনুমানিক ১৫৭০ খ্রিস্টপূর্বে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। হৃদরোগ, উদরাময় এবং মানসিক রোগ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যসমৃদ্ধ পাণ্ডুলিপির নাম ইবেরাস প্যাপিরাস। শল্য চিকিৎসা
পদ্ধতির প্রাথমিক জ্ঞান লিপিবদ্ধ করা রয়েছে এডউইন স্মিথ প্যাপিরাসের গায়ে।
এরূপ শত শত পাণ্ডুলিপি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিতদের
জ্ঞানপিপাসু, গবেষণাবান্ধব মন সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়।
এডউইন স্মিথ প্যাপিরাস; Image Source: Ancient Europeযদিও
মিশরীয় সভ্যতার প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির বেশিরভাগই ভুল ছিল, কিন্তু আধুনিক
যুগের উন্নতমানের চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দীর্ঘ সফরে পেশেহেতের মতো
ডাক্তারদের অদ্ভুত চিকিৎসা পদ্ধতি অগ্রদূত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালক
করেছে। তখন মানুষ জীবাণু সম্পর্কে জানতো না। বড় বড় ব্যাধির কারণ সম্পর্কে
জানার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং প্রযুক্তি তখনও আবিষ্কৃত হয়নি।
সামান্য
কিছু ভেষজ ঔষধ আর ধারালো ছুরিই ছিল তাদের প্রধান সম্বল। তাই আজ হাজার বছর
পরেও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নিকট প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার পণ্ডিতগণ
শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে পরিগণিত হন। মিশরীয় সভ্যতা যে চিকিৎসা পদ্ধতির
গোড়াপত্তন করেছিল, তা শত বছর পর ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে প্রাচীন গ্রিসের
প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছে যায়। হিপোক্রেটিস, গেলেন প্রমুখের হাতে তা দুর্বার গতি
লাভ করে। এভাবে হাজারো নাম না জানা পণ্ডিত এবং চিকিৎসকগণের প্রচেষ্টায়
পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় চিকিৎসা বিজ্ঞান।
বার্ক-হেয়ার: ইংল্যান্ডের বিখ্যাত লাশ চোরদ্বয়ের আদ্যোপান্ত
ছোটখাট গড়নের দেহ, টেনেটুনে সাড়ে পাঁচ ফুটও হবে না। দেহের গঠন অনেকটা
নাচিয়েদের মতো, আর হাতে কোদাল থাকলে তার সাথে কেউ পেরে উঠবে না, হোক সেটা
মাটি খোঁড়া কিংবা মারামারি। তার চোখের দিকে তাকালেই অবশ হয়ে যায় শিকারের
দেহ, চোখের তারায় যেন শয়তান হাসছে। আর তার বন্ধুর চেহারাটাও বিশেষ সুবিধার
নয়, সরীসৃপের মতো লম্বাটে মুখ, ঠাণ্ডা নিষ্প্রভ কালো চোখ, কিন্তু তার নিচেই
লুকিয়ে রয়েছে আরেকজন খুনীর মস্তিষ্ক।
এডিনবার্গের সাংবাদিকরা তাদের
পাঠকদের কাছে এভাবেই তুলে ধরলো উইলিয়াম বার্ক আর তার বন্ধু উইলিয়াম হেয়ারের
চেহারার বর্ণনা। এই দুইজনের কুকীর্তির খবর শুনে আতঙ্কে থমকে গিয়েছিলো
উনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ সমাজ, লাশ চোর হয়ে উঠেছিল বার্ক-হেয়ারের সমার্থক
শব্দ।
লাশ চোর, যারা ‘রিসারেকশনিস্ট’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিল,
নিয়মিত হানা দিতে থাকলো ইংল্যান্ডের গোরস্থানগুলোতে। কোদাল আর হারিকেন নিয়ে
রাতের অন্ধকারে কবর থেকে চুরি করতে থাকলো সদ্যমৃত লাশগুলো। তারপর সেগুলোকে
বিক্রি করে দিতো কাঁটাছেড়ার অপেক্ষায় বসে থাকা মেডিকেল ছাত্রদের কাছে।
কিন্তু বার্ক-হেয়ার লাশ চুরি করার ধার ধারেনি, বরং তারা নিজেরাই খুন করে লাশ বানিয়ে বিক্রি করতে শুরু করলো!
আয়ারল্যান্ডের
দরিদ্র পরিবারে জন্ম উইলিয়াম বার্কের। দিনমজুর বাবার মতো তারও পেট চালাতে
নামতে হয়েছিল দর্জি, মুচিসহ অন্যান্য কাজে। পেটের তাগিদে স্কটল্যান্ডে পাড়ি
জমানোর পর ভুলে গেলো আয়ারল্যান্ডে থাকা পরিবারের কথা। স্কটল্যান্ডে
আধাসামরিক বাহিনীতে কাজ করার সময় পরিচয় হলো হেলেন ম্যাকডৌগালের সাথে, তাকেই
স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করলো বার্ক।
এদিকে ঐ
বাহিনীতেই আয়ারল্যান্ড থেকে আসা আরেকজনের সাথে পরিচয় হলো বার্কের। কড়া
মেজাজের জন্য পরিচিত এই লোকের নাম উইলিয়াম হেয়ার। হেয়ার আর তার স্ত্রী
মার্গারেট এডিনবার্গে থাকতো,
পেট চলতো নিজেদের বোর্ডিং হাউজ ভাড়া দিয়েই। সস্তা থাকা-খাওয়ার জায়গা পেয়ে
সেখানেই হাজির হলো সস্ত্রীক বার্ক। একই বাড়িতে থাকা আর একইজায়গায় কাজ করার
ফলে দুইজনের মধ্যে খাতির জমে উঠতে বেশি সময় লাগেনি।
স্কটিশ ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে রক্ষিত হেয়ার (বাম) ও বার্কের ছবি; Image Source: Union Canal Unlocked হেয়ারের
বোর্ডিং হাউজের ভাড়াটে শুধুমাত্র হেলেন আর বার্কই ছিল না। ডোনাল্ড বার্ক
নামের এক বৃদ্ধও আস্তানা গেড়েছিলো ওখানে। তারপর হঠাৎ একদিন রাতে সম্পূর্ণ
ভাড়া পরিশোধ করার আগেই পরলোকে পাড়ি জমালো সে। হেয়ারের এখন টাকার প্রয়োজন,
এদিকে মৃতদেহ গোর দেওয়ার খরচও কম নয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলো উইলিয়াম
বার্ক। এডিনবার্গের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ খুবই আকর্ষণীয় বস্তু,
জানা ছিল তার। শহরের বিখ্যাত শল্যচিকিৎসাবিদ ডক্টর নক্সের বাড়িতে হাজির হলো
দু'জন, ছালায় ভর্তি ভাড়া না মেটানো ভাড়াটের মৃতদেহ। ডাক্তার নক্সের
সেক্রেটারি মৃতদেহটির বিনিময়ে আট পাউন্ড হস্তান্তর করলো। হেয়ার নিলো সাড়ে
চার পাউন্ড, বাকিটুকু গেল বার্কের পকেটে। হঠাৎ করে হাতে কাচা টাকা আসার পর
দু'জনেরই মনে ‘ভালো একটা ব্যবসা’ শুরু করার বুদ্ধি এলো। কিন্তু তারা
নিয়মিতভাবে মৃতদেহ পাবে কোথায়?
সমাধান নিজেই হেঁটে এলো। শহরের বাইরেই
অ্যাবিগেইল সিম্পসন নামের এক বিধবা মহিলা বাস করে। প্রতি সপ্তাহে পেনশনের
টাকা নিতে শহরে আসতে হয়, যার বেশিরভাগই উড়িয়ে দেয় মদ খেয়ে। বৃদ্ধ, দুর্বল
আর একাকী এই মহিলাকে বোর্ডিং হাউজে হুইস্কি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো হেয়ার,
বৃদ্ধাও সাদরে গ্রহণ করলো তা। মাতাল হয়ে পড়তেই তার হাত-পা চেপে ধরলো হেয়ার,
আর হাত দিয়ে নাক-মুখ বন্ধ করে শ্বাসরোধ করে প্রথম নিজ হাতে কাউকে হত্যা
করলো বার্ক। তারপর বস্তাবন্দী করে গন্তব্য আবারো ডাক্তার নক্সের বাসা, হাতে
এলো কড়কড়ে কিছু টাকা।
আঁকিয়ের কল্পনায় বার্ক-হেয়ার; Image Source: Irish Centralবার্ক
আর হেয়ারের পরবর্তী শিকার আরেক বৃদ্ধ। অসুস্থ জোসেফের মৃত্যু হলো বালিশের
নিচে চাপা পড়ে। বালিশ দিয়ে নাক চেপে ধরার ফলে মৃতদেহে খুব একটা ছাপ না পড়ায়
বার্ক আর হেয়ারের কাছে খুনের এই পদ্ধতিই প্রিয় হয়ে উঠলো। ময়নাতদন্তকারীকেও
বুঝতে কষ্ট হবে এই মৃত্যু স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক। ৪০ বছর বয়সী এক
ফেরিওয়ালা হেয়ারের বোর্ডিং হাউজে উঠেছিলো। ঠিক সেই সময়েই তার শরীরে বাসা
বাঁধলো জন্ডিসের জীবাণু। অসুস্থ এই মধ্যবয়সীকেও পরপারে পাঠিয়ে দিলো
বার্ক-হেয়ার, নক্সের সেক্রেটারির কাছ থেকে বাগিয়ে নিলো ১০ পাউন্ড।
এই
বৃদ্ধদেরকে কার পর কাকে খুন করা হয়েছিল তা নিয়ে বেশ সন্দেহ রয়েছে। কারণ এ
অপরাধগুলোর স্বীকারোক্তি বার্কের মুখ থেকে নেওয়া হয়েছিল। বার্ক আর হেয়ার
দু'জনে মিলে এতগুলো খুন করেছিলো যে, কার পরে কাকে এবং কবে খুন করা হয়েছিলো
তাও মনে ছিল না তাদের! একের পর এক লাশ জমা হতে থাকলো। একটি লাশ হস্তান্তর
করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মেরি পিটারসেন নামক এক মহিলাকে খুন করে আবার নিয়ে
আসায় সন্দেহ করতে শুরু করে ডাক্তার নক্সের সহকারী, যদিও তাদেরকে
ঠিকঠাকভাবেই টাকা পরিশোধ করে দেয় সে।
এদিকে মেরির আকর্ষণীয় চুল কেটে
পরচুলার দোকানে বিক্রি করে দিয়ে আসে বার্ক। বার্ককে নক্সের সহকারী মেরির
দেহ কোথা থেকে পেয়েছে তা জিজ্ঞাসা করে। বার্কের উত্তর শুনে নক্সের সহকারীর
মন্তব্য করেছিলেন, “কোনো ব্যক্তি যে তার আত্মীয়ের মৃতদেহ বিক্রি করতে পারে
এই প্রথম শুনলাম!”
লাশ নিয়ে নক্সের বাড়িতে হাজির বার্ক-হেয়ার; Image Source: The Book Palaceবার্ক
আর হেয়ারের শিকাররা ছিল মূলত এডিনবার্গের সাধারণ গরীব জনগণ, যাদেরকে দেখার
মতো কেউ নেই, যারা হারিয়ে গেলেও জনসাধারণের মনে খটকা লাগবে না। যা-ই হোক,
বার্ক আর হেয়ার বেশ বড় একটা ভুল করে বসলো। তাদের পরবর্তী শিকার হলো এক
স্থানীয় ভিক্ষুক, শারীরিক আর মানসিক- উভয়দিক থেকেই বিকলাঙ্গ এই ব্যক্তি
পরিচিত ‘ড্যাফট জেমি’ নামে।
রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে বেড়ানো
ড্যাফট জেমির মুখটা সবার কাছেই পরিচিত। বার্ক আর হেয়ার আন্দাজও করতে পারেনি
ড্যাফট জেমির অনুপস্থিতি কতটা জনসাধারণের মনে আলোড়ন ফেলবে। ১৮ বছর বয়সী
জেমি বিকলাঙ্গ হলেও তার শরীরে যথেষ্ট শক্তিসামর্থ্য ছিল, তাই যখন বার্ক আর
হেয়ার তাকে মাতাল করে খুন করার চেষ্টা করলো, সে তার সর্বশক্তি দিয়েই বাধা
দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো। তবে দু'জন বলশালী ব্যক্তির সাথে একা সে কি আর পারে?
বার্ক
আর হেয়ার জেমির লাশ বিক্রি করে দিয়ে টাকা গুণতে গুণতে বাড়ি ফেরার পরদিন
যখন ডাক্তার নক্স তার সহকারীদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করলেন,
তখনই তার এক সহকারী লাশটিকে ‘ড্যাফট জেমি’ হিসেবে শনাক্ত করলেন। এদিকে
জেমির মতো একজন তরুণ কীভাবে হঠাৎ করে মারা গেলো আর কীভাবেই বা দুইজন
অপরিচিত ব্যক্তি তার লাশ নিয়ে বিক্রি করলো তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা শুরু হলো।
বার্ক
আর হেয়ারের ১৬তম এবং শেষ শিকার হলো মার্গারেট ডকার্টি, হেয়ারের বোর্ডিং
হাউজের আরেকজন ভাড়াটে। কিন্তু এই মধ্যবয়সী মহিলাই শেষ চেষ্টা করে ধরিয়ে দেয়
দুই খুনীকে। তার মুখে বালিশ চেপে ধরতেই মার্গারেট ‘খুন’ বলে চিৎকার করে
উঠেছিলেন, যা শুনতে পেয়েছিলো বোর্ডিং হাউজের ভাড়াটিয়া দম্পতি জেমস-অ্যান
গ্রে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হেয়ারের স্ত্রী তাদের সাথে একটু অদ্ভুত
ব্যবহার করা শুরু করে, তাদেরকে পাশের রুমে যেতে নিষেধ করে। এই নিষেধ করাই
কাল হয়ে দাঁড়ালো বার্ক-হেয়ারের জন্য। কৌতূহলবশত তারা ঘরে ঢুকে আবিষ্কার করে
মার্গারেটের লাশ। সাথে সাথে তারা পুলিশকে জানায়। যদিও এর মধ্যেই লাশ
ডাক্তার নক্সের মর্গে পৌঁছিয়ে গিয়েছে।
লাশ চুরির চেয়ে খুন করাই আরো সহজ বার্ক-হেয়ারের জন্য; Image Source: Prisoners of Eternityবার্ক
আর হেয়ারকে গ্রেফতার করা হয়। ডাক্তার নক্সকে ঝামেলা পোহাতে হয়নি, যদিও তার
মতো একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার কীভাবে এত তাজা লাশ নিয়মিতভাবে তার বাড়ির
দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে তা বুঝেও না বোঝার ভান করেছিলেন। বিচারের মুখোমুখি
না হলেও উত্তেজিত জনগণ তার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে তাকে শহরছাড়া করে। পরে লন্ডনে
আস্তানা গাড়লেও তার সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে ততদিনে।
অপরাধে
হেয়ারের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও তাকেও অপরাধের সাজা ভোগ করতে
হয়নি। হেয়ার পুরো অপরাধটিই বার্কের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়, বার্কও তা স্বীকার করে
নেয়। বার্ককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। মৃত্যুর পর তার লাশ পাঠিয়ে দেওয়া
হয় এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তার ব্যবচ্ছেদ করা লাশ প্রদর্শনীর
জন্য রেখে দেওয়া হয়। হেয়ার সাজা না পেলেও তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে
হয়। কারণ তাকে কেউ চিনতে পারলে হয়তো তাকে সেখানেই শেষ করে দেওয়া হবে। বার্ক
আর হেয়ারের কিংবদন্তী এতটাই প্রচলিত হয়ে পড়ে যে, লাশ চোরের আরেকটি নামই
হয়ে যায় বার্ক-হেয়ার। লন্ডনের আরেক বিখ্যাত লাশ চোর জন বিশপ, যে তার ১২
বছরের লাশ চুরির ক্যারিয়ারে কবর থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার মৃতদেহ উঠিয়ে
নিয়েছে, পরিচিতি পেয়েছিলো ‘দ্য লন্ডন বার্কারস’ নামে।
বার্ক আর
হেয়ারের কর্মকাণ্ড কিংবদন্তীতে পরিণত হতে সময় লাগলো না। ইংল্যান্ডের
বাচ্চাদের ভূতের গল্প আর ছড়ার তালিকায় যোগ হলো নতুন একটি ছড়া,
“Up the close and down the stair,
in the house with Burke and Hare.
Burke’s the butcher, Hare’s the thief,
Knox the man who buys the beef.”
বর্তমানে
এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্কের ডেথ মাস্কের পাশেই রয়েছে একটি বই। গুজব
রয়েছে, এই বইটি তৈরি করা হয়েছে বার্কের চামড়া দিয়ে, তার মৃত্যুর পর তার
শরীর থেকে চামড়া আলাদা করে এই বই বানানো হয়েছে! অন্য ব্যক্তির লাশ বিক্রি
করে নিজের পেট চালানো বার্কের জন্যও এটি অমানবিকই বলা চলে।
প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাসগুলো প্রাচীনকালে বিশ্বাস করা আর পাঁচটা
রূপকথার মতোই। যেহেতু মিশরীয় সভ্যতা ছিল বিশাল, তাদের চিন্তাভাবনার
গতিপ্রকৃতি বর্তমান মানবসমাজকে একটু হলেও আকার দিয়েছে। মিশরের তখনকার
ধর্মবিশ্বাস নিয়ে জানতে হলে যাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না কোনোমতেই, তিনি হলেন আমুন রা।
“সত্যের
প্রভু, দেবতাদের পিতা, বিশ্বমানবের স্রষ্টা, প্রাণীদের কারিগর, সকল
স্রষ্টারও প্রভু” – আমুন রায়ের প্রার্থনাসঙ্গীত এমনই। মিশরীয় দেবতাদের মাঝে
সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই দেবতা সূর্য এবং জীবনের প্রতীক। অনেক আগে মিশরীয়রা
‘আমুন’ ও ‘রা’ নামে দুজন আলাদা দেবতার পূজা করত। আমুন এবং রা একজন দেবতা
হয়ে ওঠেন খ্রিষ্টপূর্ব ২০৪০ সালের দিকে। তাদের একত্বতার তাৎপর্য বুঝতে পৃথক
সত্ত্বা সম্পর্কে বিশদভাবে জেনে নেওয়া জরুরি।
থিবসের ঈশ্বর আমুন
মাথায় হামানদিস্তাসহ নীল থিবীয় দেবতা আমুন; image source: Self Help Warehouseআগে
থেকেই থিবস প্রাচীন মিশরের বেশ গুরুত্বপূর্ণ নগরী ছিল। কিন্তু ২০৪০
খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে মিশরে রাজনৈতিক পট বদলায়, সাথে বদলায় থিবসের
ভাগ্যও। থিবসকে ঠিক করা হয় মিশরের রাজধানী হিসেবে। এরপর প্রায় এক হাজার বছর
ধরে থিবসই ছিল মিশরের রাজধানী। পরের সময়কালে রাজধানী হিসেবে টিকে না
থাকলেও মিশরের প্রধান ধর্মীয় শহর হয়ে ওঠে এটি। আর এর ফলেই থিবসের আঞ্চলিক
দেবতা আমুন মিশরের সবচাইতে শক্তিশালী দেবতায় পরিণত হয়েছিলেন। আমুন
কিন্তু প্রথম থেকেই থিবসের প্রভু ছিলেন না। ঈশ্বর হিসেবে তাকে আরাধনা
প্রথম থিবস থেকে শুরু হয়নি। বেশিরভাগ ঐতিহাসিকের মতে, আমুন আসলে ছিলেন
মিশরের শাসকশ্রেণীর মানুষদের আরাধ্য। থিবসে তার মহিমা উচ্চারিত হওয়ার আগে
তিনি দক্ষিণ মিশরে হারমোপোলিসের আঞ্চলিক দেবতা ছিলেন। তার ক্ষমতা তখন অত
মহিমায়িত হয়নি। হারমোপোলিসের স্থানীয়রা তাকে বাতাসের নিয়ন্ত্রক ভেবে পূজা
করত। ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে থিবস পর্যন্ত আমুনের আরাধনার চল চালু
হয়। থিবসের শাসকেরা তার পূজারী ছিলেন, ফলে তাকে জাতীয় দেবতার মর্যাদায়
অধিষ্ঠিত করেন। পদমর্যাদার সাথে সাথে আমুনের ক্ষমতার গল্পও বাড়তে থাকে।
১৭০০
খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে হিক্সোস জাতির আক্রমণকারীরা যখন উত্তর মিশর দখল
করে নেয় তখন শুধু দক্ষিণাঞ্চলের লোকেরা আমুনের পূজা চালু রাখে। ১৫০০
খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশরীয়রা হিস্কোসদের থেকে মিশর পুনরুদ্ধার করে। যেহেতু
তখন মিশরের মানুষের জন্য সর্বময় ঈশ্বর ছিল আমুন, তারা ধরে নেয় আমুনের
কৃপাতেই তাদের এই সৌভাগ্য। ফলে আমুনের প্রভাব আরো বাড়ে। একই সঙ্গে বাড়ে তার
মন্দিরের আকার, সংখ্যা, সৌন্দর্য ও পূজারী।
তাকে থিবসে বলা হতো
লুকানো ঈশ্বর। কারণ তিনি বায়ুর মতো বিমূর্ত জিনিসের নিয়ন্ত্রক ছিলেন।
মিশরীয়রা মানত, সবখানে আমুন আছেন, কিন্তু তাকে দেখা যায় না। পরে তাকে
উর্বরতার দেবতা বলেও মানা হতো। খোদাই করা ছবিতে আমুনকে দেখানো হয়েছে মাথায়
কাপড় পেঁচানো একজন পুরুষ হিসেবে। তার মুখে দাড়ি, হাতে মিশরীয়দের জীবনের
চিহ্ন, অপর হাতে রাজদণ্ড। মাথায় একটা হামানদিস্তা, তার ভেতর থেকে বের হয়ে
আসছে দুটো উটপাখির পালক। আরেকটা রূপে তার মাথা ছাগলের। আমুনকে বেশিরভাগ সময়
ফারাওয়ের মতো রাজসিংহাসনে বসে থাকতে দেখা যায়। আমুনের স্ত্রী আমোউনেত হলেন
আকাশের দেবী। তাকে আঁকা হয়েছে মাথায় সাপওয়ালা এক নারীর রূপে।
প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বড় দুটি মন্দির অবস্থিত
লুক্সর আর কারনাক-এ। এদের দুটোই আমুনের সেবায় নিয়োজিত ছিল। মন্দিরের
ঐশ্বর্য দেখলে বোঝা যায় আমুনের কাল্ট কতটা সম্পদশালী ছিল।
কারনাকের মন্দিরে আমুন রা এর মূর্তি; image source: Egypt Tours Portalপ্রথমত
আমুন আর পাঁচটা মিশরীয় দেবতার মতো রোজকার নৈবদ্যে খুশি ছিলেন। কিন্তু তার
ইচ্ছার চেয়ে বড় কথা তার পূজারীদের ইচ্ছা। তার পূজারীদের গুরুত্ব বৃদ্ধির
সাথেই তার গুরুত্ব বাড়াতে রা দেবতার সাথে তাকে যুক্ত করা হল। সূর্যদেবতা রা
এর সাথে মিলে তৈরি হল নতুন উপাস্য আমুন রা। মিশরীয়দের কাছে তিনি শুধু
দেবরাজ নন, বরং ফারাওদের পিতা ছিলেন। যার অসীম ক্ষমতাবলে ফারাওরা একের পর
এক যুদ্ধ জিতে যায়।
হায়ারোগ্লিফিকে পাওয়া আমুন
আমুন সম্পর্কে
লিখিত যত তথ্য পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই অতি প্রাচীন। তখনও আমুন মিশরের
সর্বোচ্চ ঐশীশক্তি হয়ে ওঠেননি। তখনও আমুনকে আর সব সাধারণ দেবতাদের কাতারেই
ফেলা হতো। ফলে আমুনের নামে খুব বেশি লিপি পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তাতে
তৎকালীন আমুনকে সমুদ্র অভিযাত্রীদের রক্ষক আর পথপ্রদর্শক করে দেখানো হয়েছে।
এখানে আমুনের গায়ের রঙ নীল।
সূর্যের দেবতা রা
খোদাই করা সূর্যদেবতা রা; image source: Wikimedia Commonsরা'কে
কিন্তু আমুনের মতো অনেকদিন সময় নিয়ে খ্যাতি অর্জন করতে হয়নি। তিনি সবসময়েই
মিশরের গুরুত্বপূর্ণ দেবতা ছিলেন। তিনি সূর্যের দেবতা। মানা হতো সকল প্রাণ
এসেছে সূর্য থেকে, সুতরাং সূর্যের মতো তার দেবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমদিকের
ফারাওদের মনে করা হত রা এর অবতার। মানুষ ভাবত রোজ সকালে সূর্য জন্মায়,
সন্ধ্যায় মারা যায়। ঠিক যেন ফারাও। পরের সকালে আবার নতুন সূর্য আসে, যেমন
আসে নতুন ফারাও। এখান থেকে তারা ভাবতে শুরু করে মৃত্যুর পরবর্তী জীবন নিয়ে।
সেই জীবনে যেন ফারাওয়ের কষ্ট না হয়, আর ফারাও পুনর্জন্মে ঠিকমত রাজা হতে
পারেন তাই তার দেহ অক্ষত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল প্রাচীন মিশরীয়রা।
একবার
তো রা ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন। তার বয়স হয়েছে বলে মানবসমাজ তাকে আর আগের মতো
মর্যাদা দেয় না। তার বাবা 'নু' দেবতাদের মাঝে সবচেয়ে প্রাচীন। নু তাকে
বললেন, তোমার এত রেগে কাজ কী? এটা চোখ দিলেই তো মানবজাতি শাস্তি পেয়ে যাবে।
রা শাস্তি দিতে হাথর আর সেখমেথ কে পাঠিয়েছিলেন, তারা পুরো মানবজাতি ধ্বংস
করে দিতে চায়। রা এত বেশি শাস্তি চাননি। তিনি হাথর আর সেখমেথকে ভুলিয়ে
ভালিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা করেন। এমন আরো গল্প প্রচলিত আছে সূর্যদেব রা কে
নিয়ে।
রা কে চেনা যায় বাজপাখির মাথা দিয়ে। মাথার উপর আছে সূর্যের
চাকতি। মেম্ফিস মিশরের রাজধানী থাকাকালে প্রধান দেবতা ছিল রা। কিন্তু ২০৪০
খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রাজধানী বদল হওয়ার পর রা মিলে গেল থিবীয় ঈশ্বর আমুনের
সাথে। তাদের এই জুটি মিশরের স্বর্ণযুগে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেবতা হিসেবে
পূজো পেয়ে গেছেন।
কিশতিতে চড়ে রা রোজ পূর্ব থেকে পশ্চিমে যান; image source: National geographic society
আমুন রা, মহান দেবতা
একসাথে
মিলে যাওয়ার ফলে তাদের বৈশিষ্ট্য, রূপ ও ক্ষমতারও মিল হয়। মিলিত সত্ত্বার
মাঝে আমুনের মতো উর্বরতা শক্তি বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা যেমন ছিল,
তেমনই ছিল রা এর মতো সূর্যের মালিকানা আর পূনর্জন্মের শক্তি। আরো বেশি
শক্তিশালীরূপে তিনি উচ্চারিত হতেন ফারাওদের সাথে। নাবিকদের রক্ষক হয়ে গেলেন
সম্রাটদের রক্ষক।
আমুন রা'র রূপ
প্রভাবশালী দেবতা আমুন রা; image source: Flickrপাথরের খোদা করা লিপিতে আমুন রা'র বিভিন্ন রূপ
আমরা পেয়েছি। এদের একটা হলো আমুন রা দুটি ভূমির এক সিংহাসনের মালিক। এখানে
আমুন রা'র মাথায় শোভা পায় লাল ও সবুজ অথবা লাল ও নীল রঙের দুইটি পালক। এই
রূপটির হাতে আছে রাজদণ্ড। আরেকটি বিশেষ রূপ হল ‘আমুন রা আতুম’। এটি থিবীয়
আমুন রা এর রূপ। এখানে দেবতার মাথা বাজপাখির ন্যায়, মাথার উপর সূর্যের
চাকতিকে ঘিরে আছে একটা সাপ। একটা ব্যতিক্রমী রূপ হলো ‘আমোন মিন কামু্তেহপ’ ।
দেবতা এখানে একটা বাচ্চা ষাঁড়। সকাল বেলায় তিনি বাচ্চা থাকেন। বেলা বাড়ার
সাথে সূর্যের গতিতে তার বয়স বাড়ে। সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। আবার পরের দিন
তিনি নবজীবন লাভ করেন।
রোমানদের জুপিটার আর গ্রিকদের জিউসের মতো আমুন
রা জায়গা করে নিয়েছিলেন মিশরের সমসাময়িক রাজনীতি, অর্থনীতি আর সাহিত্যে।
আর সময়ের স্রোতে তিনি বেঁচে রয়েছেন উপকথার মাঝে।
বর্তমানে ক্রিকেটার থেকে রাজনৈতিক বনে যাওয়া ইমরান খানের সুবাদে অনেকে
খাইবার পাখতুনখোয়াকে চেনেন। এ প্রদেশে তার তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টির সরকারই
ক্ষমতায়। আজ তারা পাকিস্তানের হিস্যা, অথচ ৪৭ এর দেশবিভাগের সময় দু-একটা
ব্যাপার হেরফের হলেই হয়ত তা সম্ভব হত না! কংগ্রেস নেতাদের প্রতি তাদের মহান
নেতা বাচা খানের শেষ উক্তি ছিলো-
আপনারা আমাদের নেকড়ের মুখে ছুঁড়ে মারলেন!
কী
এমন ঘটেছিল প্রদেশটির সাথে? কী করেছিল কংগ্রেস? কেনই বা নেতা বাচা খানের
অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাইবার পাখতুনখোয়া যোগ দিয়েছিল পাকিস্তানে? তার উত্তর
খোঁজা হবে এখানে।
আজকের খাইবার পাখতুনখোয়া বলতে আমরা যে অঞ্চলটি
চিনি, তা ছিল সিন্ধুর পশ্চিম অববাহিকার হিন্দুকুশ পর্বতমালা ঘেঁষা
পশতুভাষীদের বিস্তীর্ণ ভূমি। এই পশতুভাষীদের পশতুন, পাখতুন বা পাঠান বলা
হয়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে প্রথম শতকে অঞ্চলটি ছিল বৈদিক গন্ধরণ সভ্যতার
সূতিকাগার। পালাক্রমে সেখানে শাসন করেছেন আলেকজান্ডার, মৌর্য, মাহমুদ গজনি,
চেঙ্গিস খান ও মোঘলরা। ১৮ শতকে পাঞ্জাবি ও পাখতুনদের এলাকাগুলো ছিল শিখ
রাজাদের দখলে। ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব ও ১৮৭৮-৮০'র যুদ্ধে আফগানিস্তান দখল করে
নেয় ব্রিটিশরা। আফগানিস্তানের পাখতুন এলাকা আর আজকের খাইবার পাখতুনখোয়া তখন
ছিল মিলেমিশে একাকার।
ওয়াজিরিস্তানে অস্থিতিশীলতা ও দুই যুদ্ধের পর ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ-ভারত থেকে আফগানিস্তানকে আলাদা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত
নেয়া হয়। ২ নভেম্বর স্যার মর্টিমার ডুরান্ড ও আফগান আমির আবদুর রহমান
খানের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে সাক্ষরিত হয় এক চুক্তি। সেই থেকে আফগানিস্তান
ও ব্রিটিশ-ভারতের মধ্যকার বিভাজনরেখার নাম ডুরান্ড লাইন। এই এলাকায় পূর্বে
মূলত বাস করত পাখতুন ও পাঞ্জাবিরা। কিন্তু এই ডুরান্ড লাইনের বিভাজন
নৃতাত্ত্বিক উপায়ে টানা হয়নি। সিন্ধু নদের অববাহিকা ও হিন্দুকুশ পর্বতমালার
অবস্থানের ভিত্তিতে হয়েছিল। ফলে পাখতুন অধ্যুষিত পেশোয়ার, অ্যাবোটাবাদ,
সোয়াত উপত্যকা ইত্যাদি রয়ে যায় ব্রিটিশ-ভারতে এবং পাখতুনদের বাকি এলাকা চলে
যায় আফগানিস্তানে। এভাবে পাখতুনদের এলাকা বিভক্ত হয়ে যায় দুই দেশে!
Imge Source: Young Diplomtপাখতুনিস্তানের
ব্রিটিশ-ভারতীয় অংশটির নাম দেয়া হলো উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ,
সংক্ষেপে NWFP. আফগানিস্তানের পাখতুনরা এই অংশটিকে ফিরে পেতে চাইত, এমনকি
এপারের অনেক পাখতুনও চাইত আফগানিস্তানে যোগ দিতে। এতদসত্ত্বেও NWFP এর
বেশিরভাগ মানুষ বৃহত্তর ভারতীয় জাতীয়তাবাদকেই গ্রহণ করেছিল। ১৯৩৭ সালে
স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পায় প্রদেশটি।
পাখতুনরা ছিল লড়াকু-বিদ্রোহী
জাত। উত্তর-পশ্চিম ব্রিটিশ-ভারতে পাঞ্জাবি আধিপত্যবাদকে তারা দেখত ঘৃণার
চোখে। সাংস্কৃতিকভাবে তারা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এমনকি আজকের তালেবান
অধ্যুষিত এই প্রদেশটিই ব্রিটিশ আমলে সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ প্রদেশের একটি
ছিল। এসব কারণে সুন্নি-মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ হয়েও ভারতবর্ষের
হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণে এখানকার মানুষের সমর্থন ছিল না। খিলাফত, হিজরত
ইত্যাদি আন্দোলনেও সক্রিয় ছিল এই প্রদেশের মানুষ।
তাদের নেতা ছিলেন
খান আবদুল গাফফার খান ওরফে বাচা খান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভারত যখন
উত্তাল, তখন তিনি ও তার ভাই ড. আবদুল জব্বার খান তাদের সাথীদের নিয়ে 'খুদায়ি খিদমতগার'
নামে এক অহিংস আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। গান্ধীর 'সত্যাগ্রহ' দ্বারা
অনুপ্রাণিত ছিল তা। খুদায়ি খিদমতগার অরাজনৈতিক আন্দোলন হলেও বাচা খান
রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে ছিলেন কংগ্রেসপন্থী। ভারতবর্ষের অল্প কিছু নেতার
মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন, যিনি জাতীয়-রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় সংকীর্ণতার
ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন। কথিত আছে, খুদায়ি খিদমতগারই নেতাজি সুভাষ চন্দ্র
বোসকে আফগানিস্তান সীমান্ত হয়ে জার্মানি ও সর্বশেষ জাপানে পালিয়ে যেতে
সহায়তা করেছিল।
অহিংস আন্দোলনের বিপুলসংখ্যক কর্মীর সাথে বাচা খান (সাদা কাবুলি); Image Source: The Friday Timesএই বাচা খান যখন দেখলেন তার সাথে আলোচনা না করেই কংগ্রেস-মুসলিম লীগ মিলে ভারতভাগের ছক কষে ফেলেছে, মর্মাহত হলেন তিনি। মনেপ্রাণে ভারতের অখণ্ডতা
কামনা করতেন। এও জানতেন যে, ধর্মের আবেগকে পুঁজি করে সৃষ্ট বিভাজনকে তিনি
বা তার সেকুলার খুদায়ি খিদমতগার কখনোই ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু তিনিও অনড়
ছিলেন, পাকিস্তানে যোগ দেবেন না। এজন্য তিনি চেয়েছিলেন প্রদেশটিকে নিয়ে
পৃথক স্বাধীন দেশ 'পাখতুনিস্তান' গড়া হোক।
পাকিস্তানের মুসলিম লীগ যে
এই দাবি মানবে না, তা ছিল স্বাভাবিক। তবে এর বাইরেও ছিল আরেকটি কারণ। ইগো
সমস্যা। কংগ্রেসের ঐ অর্থে আপত্তি ছিল না NWFP-কে পাকিস্তানে দিয়ে দিতে।
ফলে খান ভ্রাতৃদ্বয় যদি নিজ থেকেই পাকিস্তানে যোগ দিতে চায়, তবে প্রদেশ
অন্তর্ভূক্তির কৃতিত্ব মুসলিম লীগ পাবে না। তাই মুসলিম লীগ চেয়েছিল, তাদের
দাবির প্রেক্ষিতে গণভোট হোক, NWFP পাকিস্তানে যোগ দিক এবং পাকিস্তানের
গঠনের সবটুকু কৃতিত্ব তারাই একচ্ছত্রভাবে পাক।
গান্ধীর সাথে বাচা খান; Image Source: afghanistn timesNWFP
এর প্রাদেশিক বিধানসভায় ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। হ্যাঁ, আফগানিস্তান
সীমান্তলাগোয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে কংগ্রেস। ওদিকে সবচেয়ে জনপ্রিয়
দুই নেতা বাচা খান ও তার ভাই ড. খানও পাকিস্তানের বিপক্ষশক্তি। তাই উদ্ভূত
পরিস্থিতি এড়াতে ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেন জিন্নাহ ও নেহরুর সম্মতিতে
সিলেটের আসামের সঙ্গে NWFP-তেও গণভোটের সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে গণভোটে রাখা হলো কেবল দুইটি পছন্দ- হয় ভারত, নয় পাকিস্তান; পাখতুনিস্তানের কোনো সুযোগ নেই।
নির্বাচিত
প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা থাকার পরও প্রদেশের ব্যাপারে গণভোট নেওয়াই ছিল
অযৌক্তিক। তাই গণভোটে রাজি হয়ে খান ভ্রাতৃদ্বয়কে হতবাক করল কংগ্রেস। এরপর
আবারও। নেহরু জানতেন তাদের মিত্র খান ভ্রাতৃদ্বয়ের ও প্রাদেশিক কংগ্রেসের
দাবিই হল গণভোটে পাখতুনিস্তান চাইবার সুযোগও থাকুক। এ সত্ত্বেও নেহরু
গণভোটে কেবল দু'টো অপশন রাখায় সমর্থন দিয়েছিলেন।
২১ জুন বান্নুতে
বাচা খান প্রাদেশিক পরিষদের সকল সদস্য, মির্জা আলি খান ও অন্যান্য আদিবাসী
নেতাদের নিয়ে পাখতুনিস্তানের দাবিতে ঐক্যমতে আসেন এবং বান্নু চুক্তি
সাক্ষরিত হয়। এরপর দিল্লিতে দফায় দফায় মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের নেতাদের সাথে
সংলাপে বসেন তিনি। মুসলিম লীগ বান্নু চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। ভেবেছিলেন
কংগ্রেস অন্তত একটু দয়া করবে, দাম দেবে তার এতদিনের আনুগত্যের। কিন্তু
মহাত্মা গান্ধী ছাড়া নেহরু, প্যাটেলসহ কোনো নেতাই চাননি পাখতুনিস্তান হোক।
তাদের
যুক্তি ছিল, পাখতুনিস্তানে সমর্থন দিতে গেলে দক্ষিণ ভারতের ত্রিবাঙ্কুরও
বেঁকে বসবে স্বাধীনতার দাবিতে। তাই এক স্বাধীন দেশ বানাতে সম্মতি দিতে গিয়ে
নিজ দেশে বিপদ ডেকে আনা হবে আত্মঘাতী কাজ। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান
কায়দায় বিচ্ছিন্ন একটা ভূখণ্ডকে নিজেদের অংশ বানানোর ঝামেলায় যেতেও রাজি
ছিল না কংগ্রেস। তখন বড় আক্ষেপভরা কণ্ঠে কংগ্রেসের সেই নেতাদের বাচা খান
বলেছিলেন,
"আপনারা আমাদের নেকড়ের মুখে ছুঁড়ে মারলেন!"
বাচা খান ও জওহরলাল নেহরু; Image Ssource: The Pashtun Times
২৭
জুন বাচা খান তথা খুদায়ি খিদমতগার গণভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। তাদের যুক্তি
ছিল, মাউন্টব্যাটেন যখন এতটাই উদার যে আমাদের অধিকার দিচ্ছেন নিজস্ব দেশ
বেছে নেবার, তখন সেই নীতিতেই তিনি কেন গণভোটের অপশনে পাখতুনিস্তানকে রাখছেন
না? কিন্তু লাটসাহেব ছিলেন অনড়। ব্রিটিশরা চায়নি আফগানিস্তান ও রাশিয়ার
মদদপুষ্ট পাখতুন জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে এমন দেশের জন্ম দিতে, যারা দক্ষিণ
এশিয়ায় রাশিয়ান বলয়কে শক্তিশালী করবে।
৪ জুলাই এক টেলিগ্রাম বিবৃতিতে
নেহরুর কংগ্রেস গণভোট থেকে সরে যাবার ঘোষণা দেন। প্রদেশের ব্যাপারে
সিদ্ধান্ত নিতে পারত প্রাদেশিক পরিষদই, এর বদলে গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়
নেহরুর সম্মতিতেই। এই নেহরুই বলছেন, ভোটেও অংশ নেব না। বিবৃতি অনুযায়ী 'ছোট
ও দুর্বল' একটি প্রদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখতে চাননি নেহরু। কিন্তু
নির্বাচনী মাঠে থেকে NWFP-কে ভারতে রাখার তৎপরতাও দেখালেন না তিনি।
এই গণভোটের গোড়াতেই ছিল গলদ।
বিশ্বের নানা দেশ মিলিয়ে পাখতুন বা পাঠানরা সংখ্যায় প্রায় ৫ কোটি। এদের
একটা বিশাল অংশকেই উপজাতি গণ্য করা হয়, কেননা রাজনৈতিকভাবে তারা পরিবার বা
গোত্রভেদে পরিচালিত হয়। সে অনুযায়ী তারাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপজাতি।
তৎকালীন NWFP-তে পঁয়ত্রিশ লাখ পাখতুনের মধ্যে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতিদেরই
বাদ দিয়ে মাত্র ৬ লাখকে ভোটাধিকার দেয়া হয়। প্রদেশটির সোয়াত উপত্যকা, দির,
আম্ব ও চিত্রলের কাউকে দেয়া হয়নি ভোটাধিকার। এ গণভোটে গণতন্ত্র ছিল না, ছিল
নিরেট প্রহসন।
নির্বাচনের আগেই জওহরলাল নেহরু প্রদেশটির মুসলিম
লীগপন্থী গভর্নর ওলাফ ক্যারোরের অপসারণের জোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন, সঙ্গী
ছিলেন খান ভ্রাতৃদ্বয়। এর প্রেক্ষিতেই ক্যারোর অপসারিত হন, দায়িত্বে আসেন
স্যার লব রোকহার্ট। নির্বাচন আয়োজনের ভার পড়ে তারই কাঁধে। নির্বাচনী মাঠে
মুসলিম লীগ ছিল অতি-সক্রিয়। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যন্ত কর্মী ভাড়া
করে আনা হয়েছিল প্রদেশটিতে প্রচারণার জন্য। এমন প্রচারণাও চালানো হলো, যারা
মুসলিম লীগে ভোট দেবে না তারা কাফের।
অবশেষে যা হবার তা-ই হলো। ৫১
ভাগ ভোটারের উপস্থিতিতে ২,৮৯,২৪৪ ভোট পড়ল পাকিস্তানের পক্ষে, আর মাত্র
২,৮৭৪ ভোট পড়লো ভারতের পক্ষে। ব্যস, NWFP-পাকিস্তানের প্রদেশ হল।
গণভোটের পরদিন ডন পত্রিকার উচ্ছ্বসিত শিরোনাম; Image Source: Picbearদেশভাগের
পর খিদমতগার কংগ্রেসের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে, তেরঙ্গার বদলে আনে লাল
দলীয় পতাকা। ওদিকে প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ড. খান (বাচা খানের
ভাই)-কে ছাঁটাই করে কাইয়ুম খানকে গদিতে বসান জিন্নাহ। পরের বছর ২
ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশনেই বাচা খান জিন্নহ ও
পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে নেন। এই বাচা খানই ১৯৪৮ সালের ৮ মে
প্রতিষ্ঠা করেন পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় বিরোধী দল, পাকিস্তান আজাদ
পার্টি।
এরপর থেকে ভেঙে ভেঙে জেলেই অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন
'ফ্রন্টিয়ার্স গান্ধী' খ্যাত এই নেতা। সময়ের হিসেবে মোট ২৭ বছর। ১৯৮২ সালের
বিখ্যাত 'গান্ধী' সিনেমায় আছে বাচা খানের চরিত্রও, অভিনয় করেছেন দিলশের
সিং। ১৯৮৮ সালে ৯৮ বছর বয়সে মারা যান তিনি। ২০১০ সালে প্রদেশটির নাম বদলে
রাখা হয় খাইবার পাখতুনখোয়া।
গণভোটের
আগে দিল্লিস্থ মার্কিন দূতাবাসের হেনরি গ্রিডি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে
ও NWFP গভর্নর লব রোকহার্ট মাউন্টব্যাটেনকে গোপন প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন,
পাকিস্তানের পক্ষেই রায় আসতে যাচ্ছে। ওদিকে কংগ্রেসের সভায় ফ্রন্টিয়ার
কংগ্রেসের নেতারাও একরকম মেনেই নিয়েছিলেন যে, নির্বাচন নিরপেক্ষ হলেও হয়ত
তারা জিততে পারবে না। সে হিসেবে হয়ত পাকিস্তানই ছিল খাইবার পাখতুনখোয়ার
ভাগ্যে। কিন্তু এও ভুলে গেলে চলবে না যে, নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ থাকার
পরও গণভোটে সম্মত হয়ে জনমতকে পাশ কাটানোর সুযোগ কংগ্রেসই তৈরি করে। এও ভুলে
গেলে চলবে না যে, গণভোটে অংশ না নিয়ে অখণ্ড ভারতপন্থী পাখতুনদেরও অকুল
পাথারে ফেলে দেয় কংগ্রেসই।
পাঠানরা আজ পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর
উল্লেখযোগ্য অংশ। সীমান্ত এলাকায় আফগানিস্তান ও রাশিয়ার প্রভাবে কিছুটা
বিচ্ছিন্নতাবাদ থাকলেও মোটাদাগে নেই। বাচা খান সমাধিস্থ হয়েছিলেন
আফগানিস্তানের জালালাবাদে। পাঠানদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও যেন সেই সাথে
আফগানিস্তানে পাড়ি জমিয়েছিল। যে কারণে বর্তমানে খাইবার পাখতুনখোয়ার চেয়ে
আফগান পাঠানরাই বেশি উৎসাহী দুই প্রান্তের পাঠানদের মিলে যাবার ব্যাপারে,
কাবুলের এককালের অংশ পেশোয়ারকে ফিরে পাবার ব্যাপারে। বেলায় বেলায় কম জল তো
গড়ায়নি।
0 coment�rios: